
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
জামালপুরের বকশীগঞ্জে ৫ স্কুলে ১৩ জন শিক্ষকের জাল সনদের ছড়াছড়ি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাল সনদে চাকরি বাগিয়ে নেওয়া এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়ার পর জাল শিক্ষকদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দিচ্ছে মাউশি। আর এই জাল সনদধারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সনদ জাল রয়েছে শিক্ষক নিবন্ধন সনদ, কম্পিউটার সনদ ও বিপিএড/বিএড সনদ।
তবে প্রতিনিয়ত শিক্ষার বিভিন্ন দপ্তরের তদন্তে জাল সনদধারীদের শনাক্ত করা হলেও এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলার ৫ স্কুলের ১৩ জন শিক্ষক। কেউ শিক্ষক নিবন্ধন সনদ জাল করে, কেউ কম্পিউটার সনদ জাল করে নিয়োগ ও এমপিওভুক্ত হয়ে তছরুপ করছেন সরকারি অর্থ। শিক্ষাবিদরা বলছেন, যে শিক্ষক জাল সনদ দিয়ে চাকরি করছেন তিনি কি শিক্ষা দিবেন? অনৈতিক কাজে লিপ্ত শিক্ষককে দিয়ে নৈতিকতা শিক্ষাদানের আশা করা সঠিক কাজ হবে। এদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে ব্যবস্থা নেওয়া অতীব জরুরী।
বকশীগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর কো-অপারেটিভ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে (EIIN: ১০৯৬৮১) জাল সনদ ও জাল জালিয়াতি করে নিয়োগ পাওয়া ও এমপিওভুক্ত হওয়া শিক্ষকরা হলেন, সহকারী শিক্ষক (বাংলা) মোহাম্মদ নূর নবী আকন্দ (ইনডেক্স নং-ঘ৫৬৮৮৬২৮৬), সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার) এএফ মোহাম্মদ ইউসূফ আলী (ইনডেক্স নং-ঘ৫৬৮৭২০৭৫), সহকারী শিক্ষক (ইংরেজি) মোঃ আশরাফুল ইসলাম (ইনডেক্স নং- ঘ৫৬৮৮৬২৮৭), সহকারী শিক্ষক (ব্যবসায় শিক্ষা) সুমন মিয়া (ইনডেক্স নং-ঘ৫৬৮৮৬২৮৫), সহকারী শিক্ষক (ব্যবসায় শিক্ষা) খলিলুর রহমান (ইনডেক্স নং-ঘ৫৬৮৭২০৭৬)।
একই উপজেলার পূর্ব বাঙ্গাল পাড়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে (EIIN: ১৩৩৭০৬) জাল সনদ ও জাল জালিয়াতি করে নিয়োগ পাওয়া ও এমপিওভুক্ত হওয়া শিক্ষকরা হলেন, সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান) মোহাম্মদ রাসেদুজ্জামান আলকাছ (ইনডেক্স নং-ঘ৫৬৮০৬৭৩০), সহকারি শিক্ষক (কৃষি) জামাল উদ্দিন (ইনডেক্স নং- ঘ৫৬৮০৬৭১৫) ও সহকারী শিক্ষক (ইসলাম শিক্ষা) মোঃ নুর উদ্দিন (ইনডেক্স নং-ঘ৫৬৮০৭১১৭)।
অন্যদিকে একই উপজেলার জাগির পাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের (EIIN: ১০৯৬৮২) জাল সনদ ও জাল জালিয়াতি করে নিয়োগ পাওয়া ও এমপিওভুক্ত হওয়া শিক্ষক হলেন, সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান) মরিয়ম আক্তার (ইনডেক্স নং-ঘ১১৩৬৪৮৯)।
বকশীগঞ্জ উপজেলার মেরুরচর হাছেন আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের (EIIN: ১৩০৮৪৫) এনটিআরসির সনদ জাল করে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরা হলেন, সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান) আঞ্জুয়ারা বেগম (ইনডেক্স নং-ঘ১০৫৯৪২৯) ও সহকারী শিক্ষক ( সামাজিক বিজ্ঞান) মোহাম্মদ আলী (ইনডেক্স নং- ঘ১০৫৯৪২৮)
বকশীগঞ্জের সেকেরচর নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের (EIIN: ১৩০৮৪৫) জাল জালিয়াতি করে নিয়োগ পাওয়া ও এমপিওভুক্ত হওয়া শিক্ষকরা হলেন, সহকারী শিক্ষক ব্যাবসায় শিক্ষা (হিসাববিজ্ঞান) জাহিদ আলম (ইনডেক্স নং- ঘ৫৬৮৮৬৫৬৬) ও সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান) মোঃ মোক্তার হোসেন (ইনডেক্স নং- ঘ৫৬৮৮৫৮১৪)।
শিক্ষা সংবাদের অনুসন্ধানে জানা গেছে, বকশীগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর কো-অপারেটিভ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে (EIIN: ১০৯৬৮১) সহকারী শিক্ষক (বাংলা) মোহাম্মদ নূর নবী আকন্দ যিনি একাধিক ৩য় বিভাগ নিয়ে নিয়োগ নেন ২০২২ সালে গোপালপুর কো-অপারেটিভ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের মাধ্যমিক স্তর (৯ম-১০ম) এমপিওভুক্ত হবার পর। যেহেতু ২০০৫ সালে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) প্রতিষ্ঠার পর শিক্ষক নিবন্ধন সনদ ছাড়া শিক্ষক হিসেবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ নেওয়ার সুযোগ নেই তাই তাকে ২০০৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর ইং তারিখে ব্যাকডেটে নিয়োগ দেখানো হয়।
নন এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও কোড পাওয়ার পরে ব্যক্তি পর্যায়ে এমপিওভুক্তির আবেদন করার জন্য অবশ্যই বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এর “ব্যানবেইস টিচার ডাটাবেইস” এর এমপিও টিচার ভ্যারিফাই অপশন থেকে শিক্ষকের তালিকা ভ্যারিফাই বাধ্যতামূলক থাকলেও তা না করে তাকে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। ২০০৪ সালের নিয়োগ দেখানো হলেও ব্যানবেইসে ২০১৩ থেকে ২০২২ পর্যন্ত মোহাম্মদ নূর নবী আকন্দের নাম ব্যানবেইসে নেই। অর্থ্যাৎ একাধিক ৩য় বিভাগ ও শিক্ষক নিবন্ধন ছাড়া ব্যাকডেটে তাকে নিয়োগ দিয়ে এমপিওভুক্ত করে সরকারি অর্থের তছরুপ করা হচ্ছে।
নিয়োগ জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাইলে গোপালপুর কো-অপারেটিভ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (বাংলা) মোহাম্মদ নূর নবী আকন্দকে প্রশ্ন করা হয়, ২০০৪ থেকে ২০২২ পর্যন্ত দীর্ঘ ১৮ বছর কোনো অফিশিয়াল রেকর্ড ছাড়া কিভাবে চাকরি করেছেন? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি শিক্ষা সংবাদ’কে বলেন, এই বিষয়ে প্রধানশিক্ষক ভালো বলতে পারবেন।
তার নিবন্ধন সনদ আছে কিনা প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান তার নিবন্ধন সনদ আছে। তাকে যেকোনো প্রশ্ন করা হলেই তিনি উত্তর দেন এই বিষয়ে প্রধানশিক্ষক ভালো বলতে পারবেন।
একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার) এ এফ মোহাম্মদ ইউসূফ আলী স্কুলটির মাধ্যমিক স্তর (৯ম-১০ম) এমপিওভুক্ত হবার পর ২০২২ সালে ব্যাকডেটে নিয়োগ ও এমপিওভুক্ত হন। শিক্ষক নিবন্ধন সনদ না থাকায় তিনি নিয়োগ দেখান ২০০৪ সালের ২৫ এপ্রিল। ব্যানবেইস টিচার ডাটাবেইসে ২০১৩ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তার নাম নেই। এছাড়া তিনি যে কম্পিউটার সনদ দেখিয়ে চাকরি করছে সেই সনদও জাল।
জাল সনদ ও ব্যাকডেটে নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার) এ এফ মোহাম্মদ ইউসূফ আলী শিক্ষা সংবাদ’কে বলেন, এই বিষয়গুলো প্রধান শিক্ষক সামলান। তিনি ভালো বলতে পারবেন। তিনি আরো বলেন ২০০৪ সালে নিয়োগ পেলেও ২০২২ সালে এমপিওভুক্ত হওয়ার মাঝখানের ১৮ বছর তিনি নিয়মিত ক্লাস করাননি এবং কোনো বেতন ভাতাও পাননি। তার সনদ জাল কিনা জিজ্ঞেস করলে তিনি ঠিকঠাক কোনো উত্তর দেন নি। বলেছেন এই বিষয়ে প্রধান শিক্ষক ভালো জানে। তিনি কখনো কেনো শিক্ষক নিবন্ধন পরিক্ষায় বসেছেন কিনা জিজ্ঞেস করলে বলেন তিনি কখনো কোনো শিক্ষক নিবন্ধন পরিক্ষায় বসেননি।
গোপালপুর কো-অপারেটিভ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ব্যাকডেটে নিয়োগ দেখানো হয়েছে সহকারী শিক্ষক (ইংরেজি) মোঃ আশরাফুল ইসলাম ও সহকারী শিক্ষক (ব্যবসায় শিক্ষা) সুমন মিয়াকে। এদের মধ্যে শিক্ষক নিবন্ধন সনদ না থাকায় মোঃ আশরাফুল ইসলামকে নিয়োগ দেখানো হয়েছে ২০০৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর। ২০১৩ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তার নাম ব্যানবেইস টিচার ডাটাবেইসে নেই। অন্যদিকে ব্যানবেইস টিচার ডাটাবেইসে সুমন মিয়ার নাম আছে শুধু ২০২৪ ও ২০২৫ সালের তালিকায়। জানা গেছে, শিক্ষক নিবন্ধন না থাকায় আশরাফুল ইসলাম ও সুমন মিয়াকে ব্যাকডেটে নিয়োগ দেখানো হলেও ২০২২ সালের ৭ জুলাই আশরাফুল ইসলামকে এবং ০১ অক্টোবর ২০২২ সালে সুমন মিয়াকে এমপিওভুক্ত করানোর সময় স্কুলটির প্রধান শিক্ষক এনটিআরসিএর (ঘঞজঈঅ) ভুয়া ই-রিকুইজিশন (ব-জবয়ঁরংরঃরড়হ) দেখিয়ে তাদের এমপিওভুক্ত করান।
জানতে চাইলে সহকারী শিক্ষক (ইংরেজি) মোঃ আশরাফুল ইসলামের সাথে একাধিকবার মুঠোফোনের যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। সহকারী শিক্ষক (ব্যবসায় শিক্ষা) সুমন মিয়ার সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনিও মুঠোফোনের কল রিসিভ করেননি।
গোপালপুর কো-অপারেটিভ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের জাল সনদধারী ও ব্যাকডেটে নিয়োগ নিয়ে এমপিওভুক্ত করা ওপর শিক্ষক হলেন খলিলুর রহমান। যিনি ব্যবসায় শিক্ষা বিষয়ে নিয়োগ দেখান ২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল এবং এমপিওভুক্ত হোন ২০২২ সালের পহেলা জুলাই। ব্যানবেইসে তার নামে আছে ২০২২-২০২৫ সাল পর্যন্ত। বিদ্যালয়টির মাধ্যমিক স্তর (৯ম-১০ম) এমপিওভুক্ত হবার পর ব্যাকডেটে নিয়োগ নিয়ে জাল শিক্ষক নিবন্ধন সনদ দিয়ে তিনি এমপিওভুক্ত করান।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী শিক্ষক (ব্যবসায় শিক্ষা) খলিলুর রহমানকে প্রশ্ন করলে তিনি ঠিকঠাক কোনো উত্তর দেননি। তাকে শিক্ষক নিবন্ধন পরিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বলেন তিনি কখনো কোনো শিক্ষক নিবন্ধন পরিক্ষায় বসেননি। তাকে তার নিয়োগ সংক্রান্ত প্রশ্ন করা হলে তিনি ঠিকঠাক কোনো উত্তর দিতে পারেননি। তিনি বলেন, এই বিষয়ে প্রধান শিক্ষক ভালো বলতে পারবেন।
গোপালপুর কো-অপারেটিভ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম ফারুকের কাছে এই মহাজালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত কোনো তথ্য জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানে আসতে হবে। এই কথা বলে তিনি কলটি কেটে দেন। এরপর তার সাথে একাধিকার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। তিনি বারবার কল কেটে দেন।
বকশীগঞ্জের পূর্ব বাঙ্গাল পাড়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান) মোহাম্মদ রাসেদুজ্জামান আলকাছ, সহকারি শিক্ষক (কৃষি) জামাল উদ্দিন ও সহকারী শিক্ষক (ইসলাম শিক্ষা) মোঃ নুর উদ্দিনের নিয়োগ দেখানো হয়েছে ২০১৫ সালের ১০ অক্টোবর এবং এমপিওভুক্ত করানো হয়েছে ২০২১ সালের পহেলা মে। ২০১৫ সালে নিয়োগ দেখানো হলেও ২০২১ সালের পূর্বে ব্যানবেইস টিচার ডাটাবেইসে কারও নাম নেই। জাল শিক্ষক নিবন্ধন সনদ ও এনটিআরসিএর (ঘঞজঈঅ) ভুয়া ই-রিকুইজিশন (ব-জবয়ঁরংরঃরড়হ) দেখিয়ে এই তিন শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করানো হয়েছে।
জানতে চাইলে সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান) মোহাম্মদ রাসেদুজ্জামান আলকাছ শিক্ষা সংবাদ’কে বলেন, তিনি শিক্ষক নিবন্ধন পরিক্ষা দিয়েছেন এবং তার শিক্ষক নিবন্ধন সনদ আছে। নিয়োগ পেয়েছেন ২০১৫ সালে কিন্তু এমপিওভুক্ত হয়েছেন ২০২১ সালে, মাঝখানে দীর্ঘ ৭ বছর তিনি নিয়মিত ক্লাস করিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, এই সাত বছর তিনি নিয়মিত ক্লাস করিয়েছেন। বেতন-ভাতা সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন এই সাত বছর তিনি কোনো বেতন-ভাতা পাননি। এই সাত বছরে ব্যানবেইস ডেটাবেজে তার কোনো তথ্য নেই কেন জানতে চাইলে বলেন, এই বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। প্রধান শিক্ষক ভালো জানেন।
সহকারি শিক্ষক (কৃষি) জামাল উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন তিনি এখন ক্লাসে যাবেন তাই কথা বলতে পারবেন না। পরবর্তীতে তিনি ফোন কলটি তার এক সহকর্মীকে ধরিয়ে দেন। শিক্ষা সংবাদের সাংবাদিক যখন বলেন তিনি জামাল উদ্দিনকে প্রশ্ন করতে চান জামাল উদ্দিনের কলিগকে নয় তখন তিনি কলটি কেটে দেন। এরপর কয়েকবার চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
জাল জালিয়াতির বিষয়ে সহকারী শিক্ষক (ইসলাম শিক্ষা) মোঃ নুর উদ্দিনের সঙ্গে মুঠোফোনের মাধ্যমে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।
জাল শিক্ষক নিবন্ধন সনদ ও নটিআরসিএর (ঘঞজঈঅ) ভুয়া ই-রিকুইজিশন (ব-জবয়ঁরংরঃরড়হ) দেখিয়ে তাদের নিয়োগ ও এমপিওভুক্ত করালেন জানতে চাইলে পূর্ব বাঙ্গাল পাড়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান বলেন, তিনি নিয়োগ পেয়েছেন ২০২২ সালে। এর আগের কোনো তথ্য সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না।
এদিকে বকশীগঞ্জ উপজেলার জাগির পাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের (EIIN: ১০৯৬৮২) প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান তাঁর স্ত্রী ও সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান) মরিয়ম আক্তারকে যোগদান করান ২০১৬ সালের ০২ নভেম্বর এবং এমপিওভুক্ত করান ২০১৭ সালের পহেলা জুলাই। স্নাতক পাসের জাল সনদ ও জাল শিক্ষক নিবন্ধন সনদ দিয়ে ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে এই নিয়োগ ও এমপিওভুক্ত করানো হয়।
জাল সনদের বিষয়ে জানার জন্য সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান) মরিয়ম আক্তার সাথে মুঠোফোনের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে প্রথমে তিনি কলটি রিসিভ করেন। পরবর্তীতে প্রশ্ন করা হলে “মোবাইলের স্পিকারে সমস্যা” বলে কলটি কেটে দেন। এরপর বেশ কয়েকবার চেষ্টা করা হলেও তার সাথে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে জাগির পাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান) মরিয়ম আক্তারের স্বামী মো. আব্দুল মান্নানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি শিক্ষা সংবাদকে জানান, তার স্ত্রী ও সহকারী শিক্ষক মরিয়ম আক্তারের বিরুদ্ধে জাল সার্টিফিকেটের অভিযোগটি ভুয়া। তাকে যখন প্রশ্ন করা হয়, মরিয়ম আক্তার কত তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন তখন তিনি ব্যস্ত আছেন বলে কল কেটে দেন।
মেরুরচর হাছেন আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান) আঞ্জুয়ারা বেগম ও সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান) মোহাম্মদ আলী নিয়োগ পান ২০০৫ সালের ১২ মার্চ এবং এমপিওভুক্ত হন ২০১২ সালের পহেলা নভেম্বর। দুই জন শিক্ষকের এনটিআরসিএর শিক্ষক নিবন্ধন সনদ জাল।
জাল শিক্ষক নিবন্ধন সনদের বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান) আঞ্জুয়ারা বেগম শিক্ষা সংবাদ’কে বলেন, “আমার তো শিক্ষক নিবন্ধন সনদটা নাই।”
সহকারী শিক্ষক ( সামাজিক বিজ্ঞান) মোহাম্মদ আলীর সাথে যোগাযোগ করে শিক্ষক নিবন্ধনের জাল সনদের ব্যপারে জানতে চাইলে তিনি ঠিকঠাক কোনো উত্তর দেননি। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, তার প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকের সাথে কথা বলতে।
কিভাবে জাল সনদে চাকরি করছে জানতে চাইলে মেরুরচর হাছেন আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম শিক্ষা সংবাদ’কে বলেন, “ওদের তো শিক্ষক নিবন্ধন সনদ নাই। ২০০৫ সালের মে মাসের আগে যারা নিয়োগ পেয়েছেন তাদের এমপিওভুক্ত হওয়ার জন্য শিক্ষক নিবন্ধন সনদ লাগে নাই। আমিও ২০০২ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত। আমারো শিক্ষক নিবন্ধন সনদ নাই।”
বকশিগঞ্জের সেকেরচর নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় এমপিওভুক্ত হয় ২০২২ সালে। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটি এমপিভুক্ত হলে সহকারী শিক্ষক জাহিদ আলম ও মোঃ মোক্তার হোসেনকে ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ দেখানো হয়। কেননা ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসের পর সহকারী শিক্ষক নিয়োগ ক্ষমতা পায় এনটিআরসিএ। এনটিআরসিএর সনদ জাল করে ও ভুয়া সেকশন দেখিয়ে তাদের এমপিওভুক্ত করানো হয় ২০২২ সালের ৬ জুলাই। নিন্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে (৬ষ্ঠ-৮ম শ্রণি) হিসাব বিজ্ঞান বিষয় না থাকলেও জাহিদ আলমকে হিসাব বিজ্ঞান বিষয়ে সেকশনাল শিক্ষক হিসেবে ভুয়া শিক্ষক নিবন্ধন সনদে এমপিওভুক্ত করানো হয় এবং মুক্তার হোসেনকে জাল শিক্ষক নিবন্ধন সনদ দিয়ে সামাজিক বিজ্ঞানে এমপিওভুক্ত করানো হয়। ২০২৪ সালের পূর্বে তাদের ব্যানবেইসের তালিকায় নামও নেই।
নিন্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কিভাবে হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে সেকশন টিচার হিসেবে এমপিওভুক্ত হলেন এই বিষয়ে সহকারী শিক্ষক জাহিদ আলমকে প্রশ্ন করা হলে তিনি শিক্ষা সংবাদকে জানান তাকে যেভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তিনি সেভাবেই নিয়োগ পেয়েছেন। তাকে যখন প্রশ্ন করা হয় তিনি সেকেরচর নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যায়ে কোন বিষয়ের শিক্ষক তখন তিনি বলেন তিনি ব্যবসায় শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষকতা করেন। তাকে যখন প্রশ্ন করা হয়, নিম্নমাধ্যমিক স্তরে ব্যবসায় শিক্ষা বিষয়টি থাকে না তখন তিনি বলেন, তিনি ষষ্ঠ শ্রেনীর ইংরেজি বিষয় পড়ান। নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কিভাবে নিয়োগ পেলেন জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বারবার একই উত্তর দেন “আমাকে শাখা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।”
জাল শিক্ষক নিবন্ধন সনদ ও ভুয়া নিয়োগ বিষয়ে সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান) মোঃ মোক্তার হোসেন শিক্ষা সংবাদ’কে বলেন, এই অভিযোগটি মিথ্যা। তার সনদ ঠিকঠাক আছে। ২০১৫-২০২২ পর্যন্ত তার ব্যানবেইজে কোনো রেকর্ড না থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন তিনি এই বিষয়ে কিছু জানেন না।
কিভাবে এই দুই শিক্ষকের নিয়োগ হলো জানতে চাইলে সেকেরচর নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোছাঃ সুফিয়া আক্তার শিক্ষা সংবাদ’কে বলেন, জাহিদ আলমকে হিসাব বিজ্ঞান নয় ভৌত বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিলো। যখন বলা হয় জাহিদ আলম নিজে বলেছেন তাকে হিসাব বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিলো তখন প্রধান শিক্ষক সুফিয়া আক্তার বলেন, জাহিদ আলমের নিয়োগের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। জাহিদ আলম সহ আরো কয়েকজন শিক্ষককে সেকেরচর নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি নিয়োগ দিয়েছেন। তিনি এই বিষয়ে জানেন। আরেক শিক্ষক মোক্তার হোসেনের জাল সনদের ব্যাপারেও তিনি কিছু জানেন না বলে জানান।
জাল সনদ ও ভুয়া নিয়োগ বিষয়ে জানতে চাইলে বকশীগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আজাদুর রহমান ভুঁইয়া শিক্ষা সংবাদ’কে বলেন, তিনি এই অভিযোগের বিষয়ে কিছু জানেন না। তবে তদন্ত করে অভিযোগ প্রমানিত হলে তিনি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করবেন। এক উপজেলায় এত জাল সনদধারী ও ভুয়া নিয়োগ সম্পর্কে জানতে চাইলে বকশিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিক্ষা মুরাদ হোসেন সংবাদ’কে বলেন, এই বিষয়ে তার জানা নেই। তিনি জেলা শিক্ষা অফিসার মোঃ শামছুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামালপুর জেলা শিক্ষা অফিসার মোঃ শামছুল আলমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাথে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা ময়নসিংহ আঞ্চলিক (মাধ্যমিক) উপ-পরিচালক মোহাঃ নাসির উদ্দীন শিক্ষা সংবাদ’কে বলেন, এই বিষয়ে তার জানা নাই। তিনি আগামীকাল খোঁজ নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সহকারী পরিচালক এস এম মোসলেম উদ্দিন শিক্ষা সংবাদ’কে বলেন, যারা জাল সনদে চাকরি করছেন,, তাদের বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (পরিচালক) প্রফেসর মোঃ সাখাওয়াত হোসেন খান শিক্ষা সংবাদ’কে জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।
আরও পড়ুনঃ বকশীগঞ্জে বাড়িতে সংঘবদ্ধ হামলা, নগদ ২৭ লাখ টাকা লুটের অভিযোগ
Leave a Reply