
স্টাফ রিপোর্টার
চেকরেল বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই কিশোরগঞ্জ পিডব্লিউ দপ্তর আবারও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে আলোচনায় এসেছে। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের উপস্থিতি, প্রকৃত কাজের অগ্রগতি, বেতন উত্তোলন, বদলি বাণিজ্য এবং গেইটম্যানদের কাছ থেকে মাসিক অর্থ আদায়ের অভিযোগে দপ্তরটির কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানে এমন এক চিত্র উঠে এসেছে যেখানে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার তদারকি নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রেললাইনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা একাধিক গ্যাং সদস্য নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত না থেকেও বেতন উত্তোলন করছেন। অফিস সূত্র অনুযায়ী, গ্যাং নং–০৭ এর চার সদস্যের প্রতিদিন সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে ২৭৪ থেকে ২৮১ নম্বর পিলার পর্যন্ত রেললাইনে কাজ করার কথা।
কিন্তু এপ্রিল মাসজুড়ে বিভিন্ন দিনে সরেজমিনে গিয়ে ওই এলাকায় কোনো কর্মীকে দেখা যায়নি। এ বিষয়ে পিডব্লিউ কর্মকর্তা মো. জুলহাস ফোনে দাবি করেন, গ্যাং–০৭ নরসিংদীতে কাজ করছে। অন্যদিকে টাইমকিপার নোমান জানান, একই দল ভৈরবে কর্মরত। একই গ্যাং নিয়ে দুই ধরনের বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
গ্যাং নং–০৯ সম্পর্কেও পাওয়া গেছে পরস্পরবিরোধী তথ্য। টাইমকিপার নোমান জানান, দলটি নীলগঞ্জ স্টেশনের ২৮৮ থেকে ২৯৪ নম্বর পিলারে কাজ করছে। কিন্তু সরেজমিনে সেখানে কোনো কর্মীকে পাওয়া যায়নি। পরে কর্মকর্তা জুলহাস প্রথমে বলেন দুইজন কাজ করছেন, পরে আবার জানান তারা ছুটিতে আছেন। অথচ এই গ্যাংয়ে আটজন সদস্য থাকার কথা থাকলেও বাকিদের অবস্থান সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, একাধিক কর্মী কাজ না করেই বেতন নিচ্ছেন এবং টাকার বিনিময়ে অন্যদের দিয়ে দায়িত্ব পালন করাচ্ছেন। গ্যাং নং–১১ এর ওয়েম্যান মতিউর রহমান কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন এবং রুবেল মিয়া বদলি দিয়ে কাজ করান বলে অভিযোগ রয়েছে। গ্যাং নং–০৯ এর মোস্তাফিজুর কুদ্দুসকে দিয়ে কাজ করান এবং আমিনুল হক জলিলকে দিয়ে দায়িত্ব পালন করান বলেও জানা গেছে।
গ্যাং নং–০৭ এর সামিরার পরিবর্তে রাফি নামের একজন দীর্ঘদিন কাজ করছেন বলে সরেজমিনে তথ্য পাওয়া গেছে। রাফির দাবি, পিডব্লিউ অফিস থেকেই তাকে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি কর্মচারীর পরিবর্তে অন্যকে দায়িত্ব পালনের অনুমতি দেওয়ার এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার রয়েছে কি না। গ্যাং নং–০২ এর সুর্বণা রানী ঘোষ ও তানিয়া আক্তারের নিয়মিত দায়িত্ব পালন নিয়েও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, কিশোরগঞ্জে মূল দায়িত্বে থাকার কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে অফিসে খুব কম পাওয়া যায়; অফিস সময়ের বড় অংশ তিনি নরসিংদীতে অবস্থান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নরসিংদী তার প্রধান দায়িত্ব এবং কিশোরগঞ্জে সব সময় থাকা জরুরি নয়। দায়িত্বশীল ব্যক্তির এমন বক্তব্য স্থানীয়দের মধ্যে বিস্ময় তৈরি করেছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ভৈরব বাজার থেকে আঠারোবাড়ি পর্যন্ত প্রকল্পে কর্মরত ৪৮ জন গেইটম্যানকে ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রতি মাসে এক থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।
হেডম্যান উজ্জলের মাধ্যমে এ অর্থ সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গেইটম্যান জানান, মিউচুয়াল ডিউটির শর্তে ৮ ঘণ্টার পরিবর্তে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালনের জন্য প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা দিতে হয়।
রেললাইনের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা সরাসরি জননিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। মাঠপর্যায়ে কর্মীদের অনুপস্থিতি, বদলি দিয়ে কাজ করানো এবং বেতন উত্তোলনের অভিযোগ রেলপথের নিরাপত্তা ও সরকারি অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ধারাবাহিক এসব অভিযোগে স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে দপ্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
আরও পড়ুন ঝুঁকির সাঁকো, মৃত্যুর নদী—মনু পারাপারে এখনও রশিটানা নৌকার ভরসা, সেতুর দাবিতে ক্ষোভে ফুঁসছে জনপদ
Leave a Reply