
সামরুল হক, বকশীগঞ্জ জামালপুর প্রতিনিধি: জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার বাট্টাজোড় কে.আর.আই. কামিল মাদ্রাসায় দীর্ঘদিন ধরে চলা নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও পরীক্ষা জালিয়াতির অভিযোগে অবশেষে ছয়জন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থান করেও একাধিক শিক্ষার্থীর ফাজিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার অভিযোগে এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি তদন্তে নেমেছে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়।
মাদ্রাসা সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত গভর্নিং কমিটির এক সভায় অভিযোগসমূহ পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন গভর্নিং কমিটির সভাপতি খালেদা সিদ্দিকি। উপস্থিত ছিলেন সহ-সভাপতি মামুন সিদ্দিকি এবং সদস্য সচিব ও অধ্যক্ষ সুলতান মাহমুদ খসরুসহ অন্যান্য সদস্যরা।
যাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে
সাময়িক বরখাস্ত হওয়া শিক্ষকেরা হলেন—
১. মো. আব্দুল করিম — সহকারী মৌলভী
২. আনোয়ার হোসেন — শরীরচর্চা শিক্ষক
৩. শফিকুল ইসলাম — প্রভাষক (আরবি)
৪. নেছার উদ্দিন — প্রভাষক (আরবি)
৫. জামাল উদ্দিন — প্রভাষক (বাংলা)
৬. সিদ্দিকুন নাহার — প্রভাষক (প্রাণিবিদ্যা)
মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির একাধিক সূত্র জানায়, এসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা, প্রশাসনিক অনিয়ম, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় অসদাচরণ এবং শিক্ষার্থীদের ফলাফল প্রভাবিত করার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিদেশে থেকেও পরীক্ষায় পাস!
অভিযোগের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—সৌদি আরবে অবস্থানরত কয়েকজন শিক্ষার্থী পরীক্ষা না দিয়েও ফাজিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাট্টাজোড় ইউনিয়নের ফুলদহপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মোস্তাকিম বিল্লাহ ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ফাজিল পরীক্ষার সময় সৌদি আরবে অবস্থান করছিলেন। অথচ ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, তিনি ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে (বিষয় কোড-৪১৬) জিপিএ ৩.২৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একজন পরীক্ষার্থী যদি পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিতই না থাকেন, তাহলে তার উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য বোর্ডে গেল কীভাবে? আর ফলাফলই বা প্রকাশ হলো কীভাবে?
এই ঘটনায় শিক্ষাঙ্গনে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
দ্বিতীয় ঘটনাতেও মিলল সত্যতা
এদিকে আরও একটি ঘটনায় অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা মিলেছে বলে জানা গেছে।
বাট্টাজোড় কামিল মাদ্রাসার নাইটগার্ড মুসলিম উদ্দিনের ছেলে সুমন মিয়া দীর্ঘ প্রায় তিন বছর ধরে বিদেশে অবস্থান করছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। অথচ ২০২৪ সালের ফাজিল ফাইনাল পরীক্ষার ফলাফলে তার নাম প্রকাশিত হয়।
পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর তদন্তে নেমে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়। তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর ফলাফল স্থগিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, একজন শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান করার পরও কীভাবে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ দেখানো হলো এবং তার ফলাফল প্রকাশ করা হলো?
কেন্দ্র সুপারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন:
ঘটনাগুলো প্রকাশ্যে আসার পর অভিযোগের তীর গিয়ে পড়েছে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও কেন্দ্র সুপার সুলতান মাহমুদ খসরুর দিকে।
স্থানীয়দের দাবি, কেন্দ্রের দায়িত্বশীলদের সহযোগিতা ছাড়া এ ধরনের অনিয়ম সম্ভব নয়। কারণ কোনো পরীক্ষার্থী কেন্দ্রে উপস্থিত না থাকলে তার উপস্থিতি দেখানো, খাতা প্রেরণ এবং ফলাফল প্রকাশের পুরো প্রক্রিয়ায় একাধিক স্তরের দায়িত্বশীল ব্যক্তির সম্পৃক্ততা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে অধ্যক্ষ সুলতান মাহমুদ খসরু বলেন,
“পরীক্ষার সময় মোস্তাকিম বিল্লাহ সৌদি আরবে ছিলেন এবং পরীক্ষায় অংশ নেননি—এ তথ্য সত্য। কিন্তু তিনি কীভাবে পাস করলেন, তা আমার জানা নেই। ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব তথ্য পাঠানো হবে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ই নেবে।”
কেন্দ্র বাতিলের দাবি
ঘটনার পর বকশীগঞ্জের সচেতন মহল পরীক্ষা কেন্দ্রটির কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বকশীগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি আবদুল লতিফ লায়ন বলেন,
“যদি কোনো পরীক্ষার্থী কেন্দ্রে উপস্থিত না থেকেও পাস করে থাকে, তাহলে এটি অত্যন্ত গুরুতর অনিয়ম। এর দায় দায়িত্বশীলদের এড়ানোর সুযোগ নেই। শিক্ষাব্যবস্থার সুনাম রক্ষায় বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করে প্রয়োজন হলে কেন্দ্র বাতিল করা উচিত।”
স্থানীয় শিক্ষক, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর একটি বড় অংশও একই দাবি জানিয়েছেন।
ছাত্রনেতার প্রতিক্রিয়া:
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল বকশীগঞ্জ উপজেলার মেরুরচর ইউনিয়ন শাখার সভাপতি মো. রহমত আলী বলেন,
“বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। যদি দায়িত্বশীলদের গাফিলতি বা জালিয়াতির কারণে এ ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে অনিয়মের মাধ্যমে প্রাপ্ত ফলাফল দ্রুত বাতিল করা প্রয়োজন।”
তদন্তে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়:
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ইয়াসিন আলী জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের সকল কাগজপত্র ও পরীক্ষাসংক্রান্ত তথ্য মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কাছে চাওয়া হয়েছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
জনমনে উদ্বেগ
এ ঘটনায় স্থানীয় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, পরীক্ষা না দিয়েও যদি ফলাফল প্রকাশিত হয়, তাহলে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তারা দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন, দায়ীদের শাস্তি এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, অভিযোগগুলোর তদন্ত এখনো চলমান। চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের পরই অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হবে।
আরও খবর: ছালামিটিলা সড়ক সংস্কার কাজ শিগগিরই শুরু হবে — প্যানেল চেয়ারম্যান আহমদ আলী
Leave a Reply