
নিজস্ব প্রতিনিধি তারিকুল ইসলাম তারা: কুড়িগ্রামের রাজিবপুর, রৌমারী, চিলমারী, নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারীসহ বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত; পানিবন্দি হাজারো মানুষ, তলিয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে কুড়িগ্রাম জেলায় বন্যা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটছে। ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার, ধরলা ও তিস্তা নদীর পানি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার রাজিবপুর, রৌমারী, চিলমারী, নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারীসহ প্রায় সব উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
অনেক এলাকায় ঘরবাড়ি, গ্রামীণ সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কৃষিজমিতে পানি ঢুকে পড়েছে। পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো মানুষ। নদীভাঙনের আশঙ্কাও বাড়ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকাল থেকে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সকালে পানি বিপদসীমার ২৩ সেন্টিমিটার ওপর থাকলেও দুপুর ১২টায় তা বেড়ে বিপদসীমার ২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। আগামী ৭২ ঘণ্টায় জেলার সব নদ-নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন রাজিবপুর, রৌমারী ও চিলমারী উপজেলার নদীতীরবর্তী চর ও নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দারা। অনেক পরিবারের বসতঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। বিভিন্ন এলাকার গ্রামীণ সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। মানুষ গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করছেন।
নাগেশ্বরী উপজেলার বামনডাঙা ইউনিয়নের মালিয়ানিরপাড় এলাকায় দুধকুমার নদের পানি বেড়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অসম্পন্ন অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ করায় বিস্তীর্ণ কৃষিজমি প্লাবিত হয়েছে। পাউবো জানিয়েছে, স্থানীয়দের বাধা ও ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে প্রায় ৩০০ মিটার বাঁধের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। ওই অংশ দিয়েই বর্তমানে পানি প্রবেশ করছে।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি, তিলাই, চর ভূরুঙ্গামারী, পাইকেরছড়া, সোনাহাট ও আন্ধারিরঝাড় ইউনিয়ন এবং নাগেশ্বরী উপজেলার বামনডাঙা, কেদার, বল্লবেরখাস ও কালীগঞ্জ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ আমনের বীজতলা, পাট ও সবজি ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। একইভাবে সদর, রাজিবপুর ও রৌমারী উপজেলাতেও কৃষকদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় ইতোমধ্যে ৪৬ হেক্টর সবজি ক্ষেত, ৩৬ হেক্টর আমন বীজতলা এবং ৮৪ হেক্টর পাট ক্ষেত পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। আরও কয়েকদিন পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা ইউনিট সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতিতে কৃষকদের জন্য জরুরি পরামর্শ দিয়েছে। পরিপক্ব ফসল ও সবজি দ্রুত সংগ্রহ, জমির আইল উঁচু করা, অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা এবং বন্যাকালীন সেচ, সার ও বালাইনাশক ব্যবহার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগিকে নিরাপদ উঁচু স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং মাছের ঘের ও পুকুরে জাল দিয়ে সুরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পাউবোর কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, “আগামী কয়েকদিন নদ-নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। অসম্পন্ন বাঁধ অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ করায় স্থানীয়ভাবে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।”
জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, “সম্ভাব্য বন্যা মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। উদ্ধারকারী নৌকা, শুকনো খাবার, আশ্রয়কেন্দ্র ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনকে সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগামী কয়েকদিন দেশের উত্তরাঞ্চল এবং ভারতের মেঘালয়, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের উজানে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে কুড়িগ্রামের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও খবর: চিরিরবন্দরে বিশেষ অভিযানে ৪ মাদকসেবী আদালতের ৬ মাসের কারাদণ্ড
Leave a Reply