নিজস্ব প্রতিবেদক ফজলুর রহমানঃ গল্প জীবনের মুখগুলি-১৩২ রুহুল আমিন শিপার রুহুল আমিন শিপারকে প্রথম দেখি ভ্রামণিকদের ব্রেকফাস্ট আড্ডায় বনানীর ‘আমাজন লিলি’ নামক রেস্তোরাঁয়। সেটা ২০২০ সাল।
তাকে নিয়ে এসেছিলেন কবি ও ভ্রামণিক মাহমুদ হাফিজ। রুহুল আমিন শিপার পুলিশের একজন ঊর্ধতন কর্মকর্তা। কিন্তু ব্রেকফাস্ট আড্ডায় এসেছিলেন ভ্রামণিক হিসেবেই। তিনি জাতিসংঘের শান্তি মিশনে দুবার আফ্রিকা গিয়েছিলেন। আমাদের সেই ভ্রামাণিকদলে তখনো কেউ আফ্রিকা যায়নি। আমরা তাই তার অভিজ্ঞতা আগ্রহভরে শুনেছিলাম আর অনুভব করছিলাম কালো মহাদেশটি আমরা যেরকম ভেবেছিলাম, সেরকম নয়। লক্ষ বছর ধরে সূর্যের অকৃপণ তেজে মানুষের ত্বক কালো হয়েছে, আফ্রিকা তাই কালো আফ্রিকা। রুহুল আমিন শিপার বলেছিলেন,সুদানের উত্তর ছাড়িয়ে যতই দক্ষিণে যাওয়া যায়,মানুষের বর্ণ ততই কালো। সেই কালোর ভিতর তাদের সাদা দাঁত মুক্তোর মত ঝকঝক করে,চোখ অপূর্ব উজ্জ্বলতা ধরে। সেখানকার অল্পবয়সী নারীরা ক্ষীণ কাঠামোর,ছিপছিপে ও আকর্ষণীয়া। যাযাবর হওয়ার কারণে মানুষদের চেহারা ও গাত্রবর্ণ এক নয়। দক্ষিণ সুদানের প্রধান উপজাতিটির নাম ডিংকা।
রুহুল আমিন শিপারের কাছে এ কথা জেনে আমরা আশ্চর্যান্বিত হয়েছিলাম যে সুদানে অনেক পিরামিড আবিস্কৃত হয়েছে, ২০০টি পিরামিড রয়েছে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত। আমরা কেবল মিশরের পিরামিডগুলোর কথাই শুনেছি,কেননা সেগুলো বড়ো ও দর্শনীয়। তুলনায় সুদানের পিরামিডগুলো আকারে ছোটো। সুদানে কী সম্পদ আছে? আমার এ প্রশ্নে শিপার জানিয়েছিলেন সুদানে তেল ও হীরা রয়েছে। তিনি ৬ মাস মালাকালে কাটিয়ে বাকি ৬ মাস কাটিয়েছিলেন কাদুগলিতে। এটিও দক্ষিণ সুদানের অর্ন্তভুক্ত। নামটি শুনে আমার মনে হলো কাণ্ণার গলি। ঔপনিবেশিক যাঁতাকলে আফ্রিকা কম কাঁদেনি। এক বিপুল সম্ভাবনাময় মহাদেশকে পশ্চিমারা অন্ধগলি বানিয়ে রেখেছে। কাদুগলিতে শুধু নয়,সুদানে বিয়ে করতে গেলে পাত্রকে যৌতুক নয়, পাত্রীর বাবাকেই টাকা দিতে হয় পাত্রের। আমাদের আসরের প্রতীতি হলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় বিবাহের ক্ষেত্রে যে ইসলামী সংস্কৃতি রয়েছে এটা তার অনুরূপ। মালাকালে যেমন কৃষিকাজ প্রধান,কাদুগলিতে প্রধান হলো পশুপালন। আফ্রিকা প্রাণীতে ভরা হলেও অমিতবিক্রম সিংহ বা অন্য বন্য প্রাণীকে মানুষ বশ্যতা স্বীকার করাতে পারেনি। যেসকল প্রাণীকে পেরেছে তাদের মাঝে সবচেয়ে নিরীহ আর সবচেয়ে উপকারী প্রাণী হলো গরু। চোরে নিয়ে যায় বলে তারা তাদের প্রধান সম্পদ গরুকে আলাদা রাখে না, একচালের নিচে মানুষ ও গরু ঘুমায়। পাতা দিয়ে ছাওয়া মাটির ঘরগুলোকে বলা হয় টুকুল। আফ্রিকা যে পিছিয়ে আছে বুঝতে পারলাম। তিনি বেশ ঘুরে বেড়াতেন সবুজ এলাকাগুলোতে, একটাই ভয় ছিল আর তা হলো পুঁতে রাখা মাইন। বিদ্রোহীরা অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়ালেও শান্তি মিশনের সৈন্যদের আক্রমণ করতো না, ঘরের শত্রু বিভীষণই ছিল তাদের আক্রমণের লক্ষ্য। রুহুল আমিন শিপার ফের আফ্রিকা যান ২০১০ সালে জাতিসংঘের শান্তি মিশনেই। এবারের গন্তব্য পশ্চিম আফ্রিকার দেশ লাইবেরিয়া। আটলান্টিকের তীরঘেষা দেশটির সমুদ্র সৈকত রয়েছে। তিনি সুদান দেখে মোহিত হয়েছিলেন, লাইবেরিয়া দেখে এর প্রেমে পড়ে গেলেন। এতটাই যে তার ইচ্ছা হলো পুনর্জন্মে তিনি বাংলাদেশে নয়, লাইবেরিয়াতে জন্মগ্রহণ করতে চান। কেননা লাইবেরিয়া বাংলাদেশের থেকেও সবুজ, সেখানে সারাবছর ধরে মনোরম তাপমাত্রা। বেশিরভাগ সময়েই তাপমাত্রা ২২ ডিগ্রি। আমরা সকলেই জানি পশ্চিমা শাসকরা একসময় জাহাজ ভর্তি করে আফ্রিকা থেকে কালো মানুষদের দাস হিসেবে আমেরিকায় পাঠিয়েছিল। ’কী করে তাদের দাস বানাতো?’প্রসঙ্গে তিনি জানান সাদারা কালোদের বিভিন্ন গোষ্ঠির ভেতর যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিত। তাতে দুপক্ষের হাতেই যুদ্ধবন্দী জমা হতো। এই যুদ্ধবন্দীদের দাস হিসেবে কিনে নিত সাদারা। তখন আমেরিকায় রেলপথ বসছে, সড়কপথ বসছে,সেসব নির্মাণ কাজের জন্য দরকার ছিল প্রচুর শ্রমিক। আমেরিকায় দাসব্যবস্থা বিলুপ্ত হবার পরে সাদারা আবার জাহাজে ভরে কালোদের আফ্রিকা ফেরৎ পাঠিয়ে দেয়। সবাই অবশ্য ফিরে আসেনি। কিন্তু যারা ফিরে এসেছিল তারা আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের দুটি দেশ লাইবেরিয়া ও সিয়েরা লিওনে এসে বসতি গাড়ে। আমেরিকা থেকে ফেরৎ আফ্রিকানরা চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছুতে কতৃর্ত্ব স্থাপন করে আর বঞ্চিত করে স্থানীয়দের। কেননা স্থানীয়রা শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে ছিল। আমেরিকা প্রত্যাগতরা নিজেদের ভাবতো এলিট, আর স্থানীয়দের ভাবতো মূর্খ। প্রশাসন ছিল এলিটদেরর হাতে,দেশটি তারাই চালাতো। স্থানীয়দের ভেতর ক্ষোভ বাড়ছিল,কেননা তারা সংখ্যাগুরু হয়েও বঞ্চিত ছিল। একসময় ক্ষোভ গড়ায় সশস্ত্র সংঘাতে। লাইবেরিয়া ও সিয়েরা লিওনে জাতিগত দ্বন্দ্ব হলো এই দুই দলের দ্বন্দ্ব। আশির দশকের মাঝামাঝি সংঘাত মারাত্মক রূপ নেয়। তখন দরকার হয় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীর। আমাদের মনে পড়লো লাইবেরিয়ার প্রতিবেশী সিয়েরা লিওনে একটি রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার স্বীকৃতির কথা। এর কারণ হলো সেদেশে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে যুদ্ধ বন্ধে ও দেশটির পুনর্গঠনে বাংলাদেশী সৈন্যদের প্রশংসনীয় ভূমিকা।
'সুদান ও লাইবেরিয়া-আফ্রিকার এই দুটি দেশের মানুষের মাঝে কোথায় মিল?’আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম। রুহুল আমিন শিপার জানিয়েছিলেন দুটো দেশেই মানুষ সমান গরীব। দুটো দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত। ভাত প্রধান খাদ্য, অথচ চাল নেই। চাল আসে বিদেশ, প্রধানত ভারত থেকে। গোষ্ঠিদ্বন্দ্ব আর দুনীর্তির কারণে আফ্রিকার দেশগুলো উন্নত হতে পারছে না। অথচ কী সুন্দর দেশ! লাইবেরিয়ার আয়তন বাংলাদেশের কাছাকাছি, কিন্তু জনসংখ্যা মাত্র ৩৫ লাখ। লাইরেরিয়াতে প্রচুর কাঠ ও হীরা রয়েছে। তিনি যখন হেলিকপ্টারে করে উড়ে যেতেন সবুজের বিস্তার তার চোখে মায়াপর্দা টাঙাতো। তিনি তখনো তার এই বিরল অভিজ্ঞতা কোনো পুস্তকে লিপিবদ্ধ করেননি। ফেসবুকে লিখতেন,নিজের লেখালেখি নিয়ে তিনি বেশ সঙ্কোচবোধ করেন,নিজেকে লেখক বলতে তার আপত্তি। কিন্তু মাহমুদ হাফিজ বলেছিলেন, রুহুল আমিন শিপার ভালো লিখেন, তার লেখায় প্রচুর হাস্যরসের উপাদান পাওয়া যায়। পরে এইসব অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০২১ সালের বইমেলায় রুহুল আমিন শিপারের প্রথম ভ্রমণগ্রন্থ 'দ্রাবিড়ের আর্য দর্শন' প্রকাশিত হয় । বইটি বিপুল সাড়া জাগিয়েছিল,বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য ছাড়াও নিখাদ পাঠকরা বইটি কিনেছিল। বলা যায় প্রথম চালেই তিনি কিস্তিমাত করেছিলেন। সেবছর মে মাসে শাইনপুকুর রেস্তোরাঁয় ব্রেকফাস্ট আড্ডায় সদস্যদের ২০২১ সালে প্রকাশিত বই নিয়ে আলোচনা হয়। মাহমুদ হাফিজ বলেছিলেন, মীথ ও ইতিহাস আশ্রয়ী ভ্রমণগ্রন্থটি তার ভালো লেগেছে। সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখার ঢঙের একটি দূরাগত মিল তিনি খুঁজে পান রুহুল আমিন শিপারের লেখায় আর সেটা তার সুক্ষ্ম রসবোধে। এতে যেমন রয়েছে আফ্রিকা তেমনি রয়েছে ইউরোপ। ইউরোপ ভ্রমণের অংশেই তার নিজেকে দ্রাবিড় মনে হয়েছে। ‘দ্রাবিড়ের আর্য দর্শন’ পাঠ করলে বোঝা যায় লেখক একজন পুলিশের কর্মকর্তা। সেই পোষাক থেকে তিনি বেরুতে পারেননি। পুলিশের পরিচয় ছাপিয়ে রুহুল আমিন শিপার লেখক হিসেবে পরিচিত হবেন-এমন আশাবাদ ছিল মাহমুদ হাফিজের। রুহুল আমিন শিপারের গদ্যকে অসাধারণ বলেছিলেন কবি আবদুর রব। তার মতে লেখার বিষয় খুবই আলাদা,পাঠ আয়াসহীন আর মনে হয় পাঠক যেন নিজের কথাই লেখকের কাছে শুনছেন।
বহকাল আগে আমি একটি কবিতা লিখেছিলাম যার প্রথম পঙক্তিটি ছিল,'দ্রাবিড়কে কখনো তুমি দিও না আর্যের প্রসাধন'। ওই নামে একটি কবিতাগ্রন্থ প্রকাশের আকাঙ্ক্ষাও ছিল কিন্তু সেই নামটি রুহুল আমিন শিপারের মাথায় এসে গেছে আর হয়ে গেছে তার ট্রেডমার্ক। আমি মাহমুদ হাফিজের বক্তব্যের সাথে একমত হয়েছিলাম এ বিষয়ে যে রুহুল আমিন শিপারের লেখায় রসবোধ মুগ্ধকরি আর তিনি অত্যন্ত বিনয়ী। তার পুলিশ পরিচয় লুকানো অসম্ভব কেননা তিনি গেছেন জাতিসংঘের শান্তিমিশনে আর এ গ্রন্থ সে ভ্রমণ অভিজ্ঞতার ফসল। তবে তার ভাষাকে, অন্তত প্রথম দুটি অধ্যায়ে আড়ষ্ট মনে হয়েছে। আমি আরেকটু ডিটেলস আশা করেছিলাম। যেমন প্রথমদিকে কেবল প্রশিক্ষণ,বিমানবন্দরে যাওয়া আর প্লেনে চড়া আর প্লেন থেকে নামার ঘটনা পাই। বিমানবন্দর, বিমান,বিমানবালা, বিমান থেকে দেখা আকাশ ও ভূদৃশ্যের বর্ণনা পাই না। আমার ওই ডিটেইলস প্রত্যাশা প্রসঙ্গে রুহুল আমিন শিপার বলেছিলেন, 'কামরুল ভাই আমার দুর্বলতা ধরতে পেরেছেন।' তিনি এর ব্যাখ্যা দেন এভাবে, 'এঘটনাগুলো ঘটেছে ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালে। তখন তো ভাবিনি এসব নিয়ে লিখব। লেখার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। কোনো নোট নেইনি। ছবিও তেমন নেই।' 'আপনি তো নোট নেন, তাই না?' আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন। পুলিশি জেরা নয়, লেখকের বিনয়ী জিজ্ঞাসা। মাথা নেড়েছিলাম,না নেড়ে উপায় কী? ওই মুহূর্তেও তো আমি নোট নিচ্ছিলাম। 'দ্রাবিড়ের আর্য দর্শন' লিখেছেন ১৪ মাস ধরে। শুরু করেছিলেন ২০১৮ সালে ফেসবুকে। প্রথম কিস্তি লেখার পরে বিপুল সাড়া পান, অনুরোধ আসে আরও লেখার। সে প্রণোদনায় এই বই। আমি পরে 'দ্রাবিড়ের আর্য দর্শন' নিয়ে একটি তিন পর্বে বিস্তারিত রিভিয়্যু লিখেছিলাম। লেখাটি ইকতিজা আহসান সম্পাদিত পর্যালোচনার পত্রিকা ‘বিবিধ’-এর রিভিউ সংখ্যায় মুদ্রিত হয়েছিল। সে সংখ্যাটি নিয়ে মাহমুদ হাফিজ, ইকতিজা আহসান ও আমি একবার পুলিশ হেডকোয়ার্টারে রুহুল আমিন শিপারের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। পুলিশ দুর্গে সেবারই প্রথম প্রবেশ। ফিরে এসে লিখেছিলাম ৬ পর্বের এক বিস্তারিত গদ্য। আমাদের চমৎকার আপ্যায়ন করেছিলেন তিনি। আমার রিভিয়্যুতে মাালির প্রাচীন রাজধানী তিমবুকতু নিয়ে লেখা একটি চমৎকার ইংরেজি চতুর্পদী সংযোজন করেছিলাম। আমি সেটা তাদের পড়ে শুনিয়েছিলাম,
"Tim and I off hunting went,
Found some girls in pop up tent,
They were three and we were two
And I buck one, and Tim buck Two."
সেদিন রুহুল আমিন শিপারের টেবিলে তিনটি মোটা পত্রিকা বা সংকলন দেখেই বুঝেছিলাম, ওগুলো আমাদের জন্যই সাজানো। পত্রিকাটির নাম 'অনির্বাণ'। পুলিশ বিভাগে তার সহকর্মী বন্ধু, সারদা পুলিশ একাডেমিতে রুমমেট, জয়দেব ভদ্র ছাত্রাবস্থাতেই নিজ জন্মস্থল খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি গ্রামে একটি লাইব্রেরি আন্দোলন শুরু করেন। 'অনির্বাণ' হলো সেই আন্দোলনের নাম ও মুখপাত্র। এর কিছুটা ভূমিকা দেওয়ার পরে রুহুল আমিন শিপার কল দিলেন এ মুহূর্তে রাজশাহী রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি জয়দেব ভদ্রকে। তার মুখ থেকে আমরা এই মহতী উদযোগটির ইতিহাস শুনি।
সেটা ১৯৯০ সাল,জয়দেব ভদ্র রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ছুটিতে গ্রামে গিয়ে তার মনে হলো বইপড়া আন্দোলন করলে কেমন হয়? কয়েকজন বন্ধু ও সতীর্থকে নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বই সংগ্রহ করলেন। প্রায় ৭০০ বই জোগাড় হলো। তা দিয়ে ১৫ সদস্য বিশিষ্ট দুটি পাঠচক্র গড়ে তোলেন, একটি স্কুলের ছাত্রদের জন্য, অপরটি কলেজের ছাত্রদের জন্য। পাঠচক্রে প্রতিদিন কোন একটি বইয়ের ১০০/১৫০ পৃষ্ঠা পড়া হয়,বই শেষ হলে তা নিয়ে আলোচনা,প্লট,চরিত্র,ভাষা, উপস্থাপনার কৌশল ইত্যাদি নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা চলত। এর ফল হলো দারুণ ইতিবাচক। পাঠচক্রের সদস্যদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল,তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটল। তারা স্কুল ও কলেজের পরীক্ষাগুলোতে ভালো ফলাফল করতে লাগল। জয়দেব ভদ্র একটি পরিসংখ্যান দিলেন ওই গ্রামের সন্তান এমন ৫ জন এফসিপিএস ডাক্তার আছেন। মোটকথা,একটা প্রজন্মকে তারা গড়ে তুলেছেন। ১৯৯৯ সালে জয়দেব ভদ্র বিসিএস পুলিশে যোগ দিলে এ কার্যক্রমে কিছুটা ভাটা পড়ে। কেননা তাকে সময় দিতে হয় পেশায়। এর কিছু বছর পরে তিনি যখন যশোরের এসপি হয়ে এসেছিলেন তখন কপিলমুনি গ্রামে জমি কেনেন। কয়েক বছর আগে তাদের সামর্থ্য হয় সে জমিতে প্রতি তলায় ২৫০০ বর্গফুটের একটি ত্রিতল দালান গড়ার। গ্রন্থাগারটি দোতলায়, নিচে অডিটোরিয়াম ও কিছু কক্ষ, আর তেতলায় গেস্ট হাউজ (নির্মাণাধীন)। নিচে গানের স্কুল ও চিকিৎসা কেন্দ্র আছে। একজন ডাক্তার প্রতিদিনই পালা করে রোগী দেখেন; দুটি ঔষধ কোম্পানির দেওয়া বিনামূল্যের ঔষধ দেন। দশটি কম্পিউটার নিয়ে একটি কম্পউটার ল্যাব আছে উইথ ফ্রি ইন্টারনেট। ছাত্ররা এসে তা ব্যবহার করে। এ গ্রামের পাশেই মাইকেলের কপোতাক্ষ নদ। তারা একটি ট্যুরিস্ট বোট বানিয়েছে যাতে চড়ে ৫০-৬০ জন নদীতে বেড়াতে পারে। 'অনির্বাণ'-এর কার্যক্রম শুধু শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার থেমে নেই। তারা পাইকগাছা ও পার্শ্ববর্তী তালা উপজেলার ২৫জন বিধবা/স্বামী পরিত্যক্ত মহিলাকে ২৫টি সেলাই মেশিন দিয়েছেন স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য। যেসব দরিদ্র ছাত্রীর স্কুল বাড়ি থেকে ২/৩ মাইল দূরে, তাদের সাইকেল কিনে দিয়েছেন নারীশিক্ষা প্রসারের জন্য। এছাড়া ওই এলাকার ৩০০ নারীর তৈরি করা খাবার ঢাকার একটি আউটলেটের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। খুলনা জেলায় দুটি গ্রন্থাগার 'ক' শ্রেণির,একটি খুলনা শহরের উমেশচন্দ্র পাঠাগার, দ্বিতীয়টি 'অনির্বাণ পাঠাগার'। আমরা জয়দেব ভদ্রের কথা শুনে চমৎকৃত হলাম,প্রাণিত হলাম। জাপানীরা একেই বলে Kaizan বা Continuous Improvement। ওই অঞ্চলে আগে চ্যারিটির অনুশীলন ছিল না, 'অনির্বাণ' তা সৃষ্টি করেছে,তাদের দেখে অনেকেই এখন চ্যারিটি করছে।
সেদিনের সেই আড্ডায় রুহুল আমিন শিপার আমাদের অবাক করে জানিয়েছিলেন তিনি আর লিখতে পারছেন না (Writer’s block)। 'দ্রাবিড়ের আর্য দর্শন'-এর সাফল্যের (ডিবাটেন্ট সেঞ্চুরি) পর পাঠক প্রত্যাশার পারদ শীর্ষে গিয়ে ঠেকেছে। তিনি বলেন,'এখন তো আর ভ্রমণ হচ্ছে না। কবে হবে আমি জানি না। ততদিন কী করব?' নিজেই এর সমাধান বের করেছেন। তিনি ফিকশন লিখবেন। আপাতত যাত্রা শুরু হবে ছোটোগল্পের নদী বেয়ে। অতঃপর বৃহৎ সমুদ্র উপন্যাস। তার স্মৃতিতে, স্বচক্ষে দেখা এবং শোনা এমন অনেক ঘটনা আছে যেগুলো গল্পসম বা গল্পের চেয়ে বিস্ময়কর (Life is stranger than fiction)। প্লটের অভাব নেই। প্রশ্ন হলো কোন ফর্মে লিখবেন,ভাষা কী হবে? আমি বলেছিলাম,বিষয়বস্তু (content) অনেকসময় আঙ্গিক (form) নির্ধারণ করে দেয়। ঘটনাগুলো প্রথমে লিখে ফেলুন, এরপর ভাবুন কী করে পরম্পরা সাজাবেন। তারপর তাকান ভাষার দিকে। আবার উল্টোটাও হতে পারে। ভাষা এসে গেল, তার মালায় গাঁথুন ঘটনার ফুলগুলো। রুহুল আমিন শিপার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, আচ্ছা কামরুল ভাই, আপনি এত লেখেন কী করে?’ ভ্রমণের অবরুদ্ধতা কেটেগিয়েছিল ২০২২ সালে। তিনি গিয়েছিলেন আলেক্সান্দার পুশকিন, লিউ তলস্তয়, ফিওদর দস্তয়ভস্কি, ম্যাক্সিম গোর্কির দেশ রাশিয়ায়। আমাদের শুনিয়েছিলেন রাশিয়া ভ্রমণের গল্প। প্রথমেই সেন্ট পিটার্সবাগ শহরে। সেখান থেকে সুপারফাস্ট ট্রেনে তারা মস্কোতে যান। রাশিয়ান-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে পশ্চিমের অনেক কোম্পানিই মস্কোতে ব্যবসা বন্ধ রেখেছে। চলে গেছে ম্যাকডোনাল্ডস। আমরা সপ্রশ্ন হই মস্কোর আন্ডারগ্রাউন্ড নিয়ে, কারণ মাসরুর আরেফিন তো এক উপন্যাসই লিখে ফেলেছেন মস্কোর আন্ডারগ্রাউন্ড নিয়ে। রুহুল আমিন শিপার বললেন, মস্কো মেট্রোসহ অর্ধেক শহরই মাটির কয়েকশ ফিট নিচে। পরদিন দুপুর গেলেন মস্কোভা নদীতে নৌবিহারে। মস্কোভা নদীর দুইপাড় পাথর দিয়ে বাঁধানো, দুপাশে পার্ক,দৃষ্টিনন্দন সব স্থাপনা,ভাস্কর্য। মনে হলো স্বর্গের একটি নদীতে ভাসছেন। নৌবিহার থেকে ছুটলেন বিমানবন্দরের দিকে। সাইবেরিয়ান এয়ারলাইন্সের এয়ারক্রাফট নিয়ে যাবে উলান উডে শহরে। এয়ারবাস ৩২০ রঙ তার সবুজ,যাত্রীতে বোঝাই। মঙ্গোলিয়ার সীমান্তবর্তী উলান উডে ৬ ঘণ্টার ফ্লাইট,মস্কো থেকে এর সময়ের পার্থক্য ৫ ঘণ্টা। যে বিমান মস্কো ছেড়েছিল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় তা উলান উডেতে এসে পৌঁছাল পরদিন সকাল সাড়ে ছয়টায়। সেখানে আবহাওয়া রৌদ্রময়,শীত জোরালো নয়। আবহাওয়া ছাড়াও যে পরিবর্তনটি চোখে পড়লো তা হলো লোকদের চেহারায় মঙ্গোলয়েড ছাপ। শহরে উঁচু দালান বেশি নেই,তাদের হোটেলটি ৪ তলা,একেবারে নতুন হোটেল। প্রথমে গিয়েছিল হেলিকপ্টার কারখানা পরিদর্শনে। তারপর ছুটেছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো মিঠে পানির হ্রদ বৈকাল দেখতে, সবচেয়ে গভীর হ্রদও সেটি। বিকেলবেলায় টলটলে জলের দোলায়িত তরঙ্গের বৈকাল দেখে মন ভরে গেল। যে জায়গাটিতে তারা গিয়েছিল সেখানে পর্যটক তেমন নেই, বাতাসের তাপমাত্রা ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শীতে বৈকাল হ্রদ জমে বরফ হয়ে যায়, এতটাই শক্ত ও পুরু হয় সে বরফের আস্তর যে গাড়ি চালানো যায়।
সে রাতেই তারা উলান উডেতে ফিরে এসে হোটেলে রাত্রিযাপন করেছিলেন। পরদিন সকালে মস্কো ফেরার ফ্লাইট। মজার ব্যপার হলো তাদের প্লেন যখন উলান উডেতে সাড়ে আটটায় উড়ল,তখন মস্কোতে রাত সাড়ে তিনটা। পাঁচঘন্টার ফ্লাইট শেষে তারা যখন মস্কোয় অবতরণ করেছিলেন তখন ঘড়িতে সকাল সাড়ে আটটা। সাড়ে আটটায় বিমানে চড়ে পাঁচ ঘণ্টা উড্ডয়ন শেষে ফের সেই সাড়ে আটটাতেই অবতরণ যেন টাইম মেশিনে চড়ে সময়কে স্থির করে রাখা। রাশিয়া এত বড়ো দেশ? আমাদের মিলিত বিস্ময়ের উত্তরে রুহুল আমিন শিপার জানিয়েছিলেন ভ্লাদিভস্তক থেকে মস্কো একটানা ১১ ঘণ্টার আকাশভ্রমণ।
রাশিয়ায় কাটানো শেষ দিনে তারা ফের ক্রেমলিন চত্বরে গিয়েছিলেন। সেখানে লেনিনের সমাধি দেখা ছিল বিশেষ ঘটনা। ১৯২৪ সালে মৃত ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের মৃতদেহ এই প্রায় ১০০ বছর পরেও অবিকৃত অটুট রয়েছে। দেখে মনে হয় লেনিন এইমাত্র ঘুমিয়ে পড়েছেন। সেখানে যে গির্জাগুলো আছে সবগুলোই অর্থডক্স রাশিয়ান চার্চ। এগুলো ছিল জার পরিবারের ব্যক্তিগত গির্জা― কোনটি জারের শপথ নেওয়ার সেরিমোনিয়াল চার্চ,কোনটি জারের একক প্রার্থনার গির্জা, কোনটি পরিবারের সকলের একত্রে প্রার্থনার গির্জা। মস্কোর বিখ্যাত ঘণ্টাটি এখানেই রাখা। বিশালাকৃতির ঘণ্টাটি কিন্তু অটুট নয়,একটি অংশ ভাঙা। সেদিন তারা ক্রেমলিন প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন। ভ্লাদিমির পুতিনের সরকারি অফিসটি এখানেই, তবে তিনি প্রতিদিন ক্রেমলিনে আসেন না,যেদিন আসেন সেদিন হেলিকপ্টারে চড়ে আসেন। ক্রেমলিন প্রাসাদের অভ্যন্তরভাগও অত্যন্ত জৌলুষপূর্ণ। সেন্ট পিটার্সবার্গের সামার প্রাসাদের মতোই ক্রেমলিনের সিঁড়ি নেমে গেছে মস্কোভা নদীর তীর পর্যন্ত। সেখানে একটি পার্কে পৃথিবীর প্রথম নভোচারী ইউরি গ্যাগারিন প্রোথিত একটি গাছ ছিল দর্শনীয়। পুতিনের হ্যালিপ্যাডটি এর সন্নিকটেই। ব্রেকফাস্ট আড্ডার নিয়মিত সদস্য রুহুল আমিন শিপারের সাথে এভাবেই আমার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। শুধু আমার নয়, আড্ডার বাকি সদস্যদেরও। পুলিশের একজন ঊর্ধতন কর্মকর্তা আমাদের সুহৃদ-এ তথ্য আমাদের মনে সাহস জোগায়। তার বন্ধু জয়দেব ভদ্রও পরিচিতির তালিকায় এসে যুক্ত হন। পুলিশ সম্পর্কে সাধারণে যে ধারণা প্রচলিত, এরা তার বাইরে। রুহুল আমিন শিপারের মানুষের জন্য দরদ (empathy), জয়দেব ভদ্রের জনহিতকর কাজ তার সাক্ষ্য দেয়। রুহুল আমিন শিপার এখন ট্যুরিস্ট পুলিশ বিভাগের ডিআইজি,আর আমরা হলাম ট্যুরিস্ট। সুরক্ষা তো আছেই, উপরন্তু আছে।
আরো পড়ুনঃ রাজিবপুরে কৃষক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত
উপদেষ্টা:
প্রকাশক: মোছাঃ খাদিজা আক্তার
বিথী
সম্পাদক: আফজাল শরীফ
নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ হারুন-অর-রশিদ
বার্তা সম্পাদক: মোঃ আমিনুল ইসলাম বাহার
সহকারী বার্তা সম্পাদক: মুহাম্মাদ লিটন ইসলাম
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক সংলগ্ন জব্বারগঞ্জ বাজার,
বকশীগঞ্জ, জামালপুর
Copyright © 2026 দশানী ২৪. All rights reserved.